আজকাল সাজগোজ ছাড়া যেন আমরা ঘর থেকে বাইরে এক পা ফেলার কথা ভাবতে পারি না। নিয়মিত দৌড়ঝাঁপের জন্য বাসা থেকে বের হতেও সানব্লকের পাশাপাশি চাই ঠোঁটে অন্তত হালকা শেডের লিপস্টিক। অবশ্য নিয়মিত ভার্সিটি বা অফিস করতেও নারীরা বিভিন্ন ডার্ক শেডের লিপস্টিক ব্যবহার করেন, যা তাদের শুধু লিপস্টিকের ছোঁয়াতেই একটি ‘বোল্ড লুক’ পেতে সাহায্য করে। আজকে আমরা যেসব আধুনিক ফর্মুলার লিপস্টিক, লিপগ্লস কিংবা লিপ বাম ব্যবহার করি, কেমন ছিল ইতিহাসের পাতায় তার বিবর্তন? চলুন দেখে নেওয়া যাক সাজগোজের অপরিহার্য এই রঙিন ঠোঁটকাঠির বিবর্তন।
একই সময়ে এর ব্যবহার শুরু হয় মেসোপটেমিয়ায়। তারা ঠোঁটে মাখতেন রত্নপাথরে গুঁড়া। সুমেরীয় সভ্যতা থেকে মিশরীয় সভ্যতা, এরপর রোমান সভ্যতা-নারী-পুরুষ উভয়ই ঠোঁট রাঙাতে ব্যবহার করেছে বেরি বা জাম জাতীয় ফল, লাল সিসা, মাটি, মেহেদি, বিভিন্ন পোকামাকড়, গাছ-গাছড়া কিংবা বিভিন্ন খনিজ। তখন ঠোঁটের সুরক্ষায় ব্যবহার করা হতো এসব উপাদান।
কিন্তু সভ্যতার অগ্রগমনে বরাবরই এগিয়ে থাকে মিশর। এক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম ঘটেনি তার। মিশরীয়রা পেলো কোসিনিয়াল নামের একধরনের পরজীবী পতঙ্গ, যা নোপল নামক ক্যাকটাস গাছে বাসা বাঁধে। এই পতঙ্গ থেকে ঠোঁট রাঙানো উপাদান পাওয়া এতটাও সহজ ছিল না। কোসিনিয়াল পতঙ্গ নোপল গাছে বাসা বাঁধার পর পাতাগুলো কেটে আনা হতো। এরপর এসব পাতা ৯০ দিন উষ্ণ জায়গায় রেখে দেওয়া হতো। পাতায় বাসা বাঁধা কোসিনিয়ালগুলো আকারে বড় হতো ধীরে ধীরে। ৩ মাস পরে কোসিনিয়াল গুঁড়ো করে তাতে পানি মিশিয়ে পাওয়া যায় কারমাইন রঙ। চমৎকার মেরুন রঙের এই প্রাকৃতিক তরল তখন ঠোঁটে এনে দিতো রাজকীয় সৌন্দর্য।
লিপস্টিক আরেক ধাপ এগিয়ে গেলো একজন মুসলিম চিকিৎসকের হাত ধরে। পাউডার কিংবা তরল পদার্থ দিয়ে ঠোঁট রাঙানোর বদলে কঠিন পদার্থ দিয়ে ঠোঁট রাঙানোর চিন্তা আসলো মানব মস্তিষ্কে। আর সেই সূত্র ধরে আট থেকে তেরো শতকের মধ্যে সলিড লিপস্টিকের ধারণার অগ্রগতি হয়। ৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দে স্পেনের আল-আন্দালুসে জন্ম নেন আরব চিকিৎসক আবুল কাজিজ। তিনি শরীরে সুগন্ধি মাখার জন্য একটি উপাদান আবিষ্কার করেন, যা মুড়িয়ে ফেলা যাবে এবং একটি ছাঁচে ফেলা যাবে। সেই ছাঁচের উপাদান শরীরে মাখলেই সুগন্ধ হবে। কিন্তু তিনি শুধু সুগন্ধিতেই থেমে থাকলেন না, আবারও এই প্রক্রিয়া চেষ্টা করলেন। পার্থক্য হয়ে গেলো এখানে যে, এবার তিনি এসবের সাথে রঙ মিশিয়ে দিলেন। জন্ম লাভ করলো সর্বপ্রথম সলিড লিপস্টিক।
ইংল্যান্ডের রাজা দ্বিতীয় চার্লস ও ফ্রান্সের রাজা চতুর্দশ লুইয়ের রাজত্বকালে নারী-পুরুষ উভয়ই খুব গাঢ় করে ঠোঁট আবৃত করে রাখতেন। এর প্রধান কারণ ছিলো উভয় দেশে থিয়েটারের প্রসার এবং সাধারণ মানুষের জীবনে অভিনেতাদের হাল-ফ্যাশনের প্রভাব। কারমাইন আর চর্বির উপাদান নারী-পুরুষ উভয়েই ব্যবহার করতেন। এমনকি তখনকার দাড়ি-গোঁফওয়ালা পুরুষেরাও তাদের গোঁফে আবৃত ঠোঁটের নিচে লিপস্টিক পরতে দ্বিধা করতেন না।
১৯ শতকের শেষদিকে আবার ঘুরে দাঁড়ায় প্রসাধনী শিল্প। ১৮৮০ সালে প্যারিসে সুগন্ধী শিল্পেই তৈরি হয় বাণিজ্যিক লিপস্টিক। ১৮৯০ সালের শেষদিকে ইউরোপ ও আমেরিকা জুড়ে লিপস্টিক বিক্রি করা শুরু হয়। এর প্রচার প্রসারে বিজ্ঞাপন দেওয়াও শুরু হয়। এসব লিপস্টিক কাগজের কৌটায় বা টিউবে বিক্রি করা হতো।
১৯১৪ সালে সিনেমা শিল্পে ব্যবহারের জন্য সর্বপ্রথম প্রসাধনী উৎপাদিত হয়। এসব প্রসাধনী ছিল থিয়েটারে ব্যবহৃত প্রসাধনীর চেয়ে হালকা। আর এর মাধ্যমেই প্রসাধনী শিল্প এক আধুনিক বাণিজ্যের দিকে পা বাড়ায়।
১৯১৫ সালে মরিস লেভি সর্বপ্রথম ধাতব কৌটার লিপস্টিক বানালেন, যা ঠেলে ওপরে তোলা যায়। এরই হাত ধরে আধুনিক লিপস্টিকের প্রথম ধাপ সম্পন্ন হলো। এটি বহনযোগ্য, প্রস্তুতকৃত আর ছিল সাধারণ নারীদের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে। একধরনের লিপ বামও তৈরি হলো, যা ঠোঁটে দেওয়ার পর তার প্রতিক্রিয়ায় ঠোঁট লালচে হয়ে যায়। বিভিন্ন ফ্লেভারড বাণিজ্যিক লিপস্টিকও হয়ে উঠলো জনপ্রিয়।
সর্বপ্রথম সুইভেল-আপ লিপস্টিক উদ্ভাবন হয় ১৯২৩ সালে। আমেরিকার ন্যাশভিলের জেমস ব্রুস জুনিয়র এটি উদ্ভাবন করেন। এটিই হলো সেই লিপস্টিক, যা আমরা আজ ‘আধুনিক লিপস্টিক’ বলে জানি।
এভাবেই বহু ধাপ পেরিয়ে ২১ শতকে আমরা ব্যবহার করছি উচ্চ মানের আধুনিক কেমিক্যাল ফর্মুলার বিভিন্ন ব্র্যান্ডের লিপস্টিক। যুক্তরাজ্য আর যুক্তরাষ্ট্রের লরিয়েল, এস্টি লডার, ম্যাক, কালার পপ, ওয়েট এন ওয়াইল্ড ইত্যাদি ব্র্যান্ডের মতো দামি-দামি লিপস্টিকসহ এখন চীন আর জার্মানিও বাণিজ্যিকভাবে তৈরি করছে ফোকালিউর কিংবা ইমাজিকের মতো খুবই সুলভ মূল্যের ব্র্যান্ডেড লিপস্টিক। তবে উচ্চমূল্যের ব্রিটিশ কিংবা আমেরিকান ব্র্যান্ডের চেয়ে আমাদের দেশে সাধারণ স্তরে চায়না ব্র্যান্ডই এখন জনপ্রিয়তার শীর্ষে।
ঢাকা বিজনেস/এনই/