‘‘ধোঁয়াশা'র ভোরের আলোয় জীবন মরীচিকা
দিশেহারা প্রাণগুলো মুছতে চায় অন্ধকার কুহেলিকা।
একটা সময় যখন মেলে একটু আশার আলো,
আমার বাংলা বিভাগ তখন আনন্দে উৎফুল্ল। ’’
হ্যাঁ, কবিতার লাইনগুলোর মতোই ১০৪টি চোখের তীব্র তৃষ্ণা ছিল ভোরের অন্ধকারাচ্ছন্ন কুয়াশাকে অতল গহ্বরে ডুবিয়ে একটি স্নাত-স্নিগ্ধ আলোমাখা পৃথিবী পান করার। তাইতো, ৫২ প্রাণের পিপাসাযুক্ত অন্তরে প্রখর তীব্রতা, জীবন সূর্যের ঝলমলে রোদ্দুর উপভোগ করা। মুক্ত আকাশের মনপাখিটা অনেকদিন ধরেই যে বন্দি। তৃষ্ণায় ধুঁকতে থাকা ক্লান্তিময় জীবনে তাই বেড়ে গেলো প্রকৃতির কোলে নিজেকে আবিষ্কার করার ক্ষুধা।
২০২৩ সালের ১৯ মার্চ আসলো সেদিন। চৈত্রের তাবদাহ যেন দমিয়ে রাখতে পারলো না দামালদের। তাইতো পদ্ম পাতার জীবনকে ছুটি দিয়ে বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কের ১৪৯৩ হেক্টর ভূমিতে বুনেছিল সোনালি সময়ের স্বপ্নের বীজ। সবুজ ছায়া-শ্যামলে ঘেরা সুনিবিড় ৩২ একরের মায়াময় ক্যাম্পাসকে একদিনের জন্য অতীত করে দিতে বদ্ধ পরিকর সাভারের গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের এই ৫২ শিক্ষার্থী। সঙ্গে ৬ জন শিক্ষকও যেন প্রকৃতির কোনো এক অচেনা তরু তলে নিজেদের আবিষ্কারের নেশায় ছিলেন মত্ত। আর তাই, প্রকৃতির নিগূঢ় প্রতীকী হয়ে সবাই মিলে লেগে পড়লেন মনের বাঘটাকে শান্ত করতে। ভাবনা মতোই পরিকল্পনা সম্পন্ন, এবার যাওয়ার সময়।
স্থানীয় একটি লোকাল বাসে সবাইকে নিয়ে ছুটতে হবে। অশ্রু, সাজ্জাদ ও মিলু ভাইয়ের ব্যবস্থাপনার কোনো কিছুতেই যেন কমতি ছিল না। নির্ধারিত দিনটিতে ক্যাম্পাসের ট্রান্সপোর্ট ইয়ার্ডে থাকার নির্দেশনা জারি ছিল আগের দিনেই। এখান থেকেই যাত্রা শুরু হবে ঠিক সকাল ৮টায়। আহ! সবার খুশির কোনো সীমা রইল না। রাত্রি যেন কোনোভাবেই কাটছিল না। পূর্ব দিগন্তে ঊষার আলো দেখা মিলতেই আমার বিছানায় থাকার মতো ধৈর্য আর রইল না। তড়িঘড়ি করে রেডি হয়ে চলে আসলাম ক্যাম্পাসে। এসে দেখি ভোরের রক্তিম সূর্য শুধু আমি একা ভেদ করিনি ততক্ষণে প্রত্যেকেই ছুটে এসেছেন। সম্ভবত রাতে আমার মতো ঘুম হয়নি এদের কারোরই। বিলম্ব না করে উঠে পড়লাম বাসে, এ যেন এক অভূতপূর্ব অনুভূতি।
গাড়ি কিছু দূর এগুতেই সবার হাতে দেওয়া হয় নাস্তার প্যাকেট। রুটি, ডিম, কলা, পানির বোতলে এবার খেলা জমালো শরীরের সালফিউরিক এসিডও। রাসায়নিক জটিল সমীকরণে চাঙা হলো উন্মুক্ত শরীর। মন আর শরীরের যোগসূত্রে দেখা মিললো সবার গান, নাচ আর হৈচৈয়ের উন্মাদ কম্বিনেশন। যোগ দিলেন শিক্ষকরাও, বোঝার বাকি নেই তাদের মনের বয়স এখন ষোল।ক্লাসের ধারাবাহিক চিরচেনা কঠোর মুখগুলো নিমেষেই যেন প্রিয় বন্ধুদের মতো এক হয়ে মিশে গেলো।
সকাল থেকে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি ও হালকা শীতল বাতাস আশীর্বাদ হয়ে বয়ে যেত লাগলো। মনে হলো আমাদের আনন্দ আর উৎফুল্লতা দেখে ভাগ্যদেবতাও কিছু সময়ের জন্য উপহার নিয়ে এলো। মায়াময় প্রকৃতির কোলে নিজেকে বেশি সময় গেঁড়ে রাখতে পারলাম না। নাহিদ, মিতু, আইন, ফারজানার দুষ্টুমির হুঁশ হারানো বেহুঁশ সময় জেগে উঠলো আবু রায়হান স্যারের ডাকে। এ বাবা চলে এলাম যে! ভালো সময় যে পাগলা ঘোড়ার মতো দৌড়ায় সেটার নিখুঁত প্রমাণ মিললো।
এবার গেটের ভেতরে প্রবেশ করতে হবে। বা্ইরের বাস্তবতাকে ছুটি দিয়ে যখন ভেতরের বাস্তবতায় প্রবেশ করলাম নিজেকে খুব অপদার্থ মনে হলো। কেন না, স্রষ্টার পৃথিবীতে এতই যে সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে তা কখনো উপলব্ধিও করিনি। উড়ন্ত মন সবসময় ঘরবন্দি। অথচ, এই বিশাল সৌন্দর্যের সাগর হাতছানি দিয়ে প্রতিনিয়ত ডেকেই চলেছে। ছবিতে দেখতে পাওয়া প্রাণীদের সৌন্দর্য যেন এখন আধা ইঞ্চি দূরে। নিরাপত্তা বেস্টিত সাফারি গাড়িতে বসে খুব কাছ থেকেই হিংস্র বাঘ, সিংহ, ভালুকের মধ্যেও যে সৌন্দর্য রয়েছে তার বাস্তবতা উপলব্ধি করলাম। ভাবনার জগৎকে আরও একটু গভীরে ঠেলে এটাও খুঁজে পেলাম মানুষও মাংসাশী প্রাণী। এরা মানুষের চেয়ে ঢের ভালো তবুও এদের বদনাম। ভাবান্তর ঘটলো বিলুপ্তপ্রায় নীল গাই, সাদা-কালোর ক্রসিং জেব্রায়। ময়ূরের পেখমে ডানা মেলা জীবন যেন এতদিন একটি আকাশের অভাবে ভুগছিল সেটা হাড়ে হাড়েই টের পেলাম। অনুভূতিগুলো কি সবার এক হয়? একটু পরখ করে দেখা যাক।
বিভাগের মাস্টার্স পড়ুয়া খাদিজাতুল কোবরা মিমের কাছে জানতে চাওয়া অনুভবে যেন তারই প্রমাণ মিললো। তার কণ্ঠে বেজে উঠল যেন সীমান্ত অতিক্রমের সুর। গদগদ করে জানান দিলেন, বিশ্ববিদ্যালয় আসলেই এমন একটি জায়গা, যেখানে সব বাঁধানো ছবি আলিঙ্গন করার সুখ মেলে।
তিনি বলেন, আমার সময়টা ফুরিয়ে এসেছে, শিক্ষা জীবনের এই অন্তিম সময়ে এসে অনেক না পাওয়াকে নিজের করে পেতে মন চায়। দীর্ঘ চারটা বছর পর আজ যেন সে চাওয়া পূর্ণ হলো। শহরের ধরাবাঁধা ফ্রেম থেকে মুক্ত হয়ে আজ জীবনকে নতুনভাবে চিনলাম। এ যেন এক অন্য জগৎ, অন্য রূপ, অন্য স্বাদ। এটা আমার কাছে আজীবন স্মৃতির পাতায় বন্দি করে রাখার মতো একটা দিন ছিল।
প্রাণ-প্রকৃতির সঙ্গে মনের প্রচণ্ড ক্ষুধা কিছুটা মিটলেও শরীরের ক্ষুধা হুঁইসেল দিল। জীবনটা এমনই পদে পদে হুঁশিয়ারি। তাইতো, ডাক পড়লো মধ্যাহ্ন ভোজের। এক জায়গায় বসে ভোজন করার আনন্দটা সত্যি অসাধারণ। এরপর সময় দেওয়া হয় একটু ঘোরাঘুরির, সবাই তখন ব্যস্ত হয়ে ওঠে ছবি তোলায়।
ঠিক কিছুক্ষণ পরেই মনের ভেতর থাকা অনুভূতির দেয়াল ভাঙলো এবার মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে। শিক্ষার্থীরা তাদের ইচ্ছেমতো গান, কবিতা ও নাচ করেন। স্মৃতির পাতাকে আকড়ে ধরতে তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয় স্মারক স্মৃতি। আর এভাবেই কেটে যায় আনন্দ মাখা মুহূর্তটা। প্রকৃতির এত কাছে এসে আমার, আমাদের অভিজ্ঞতাকে আরও সমৃদ্ধ করতে পেরেছি এটা ভাবতে ভাবতে গা ভাসানো হলো জীবন গোলবারের ক্রসবারে। বাস্তবতার গোল খেয়ে বিদায় দিতে হবে সারাদিনের আনন্দ মাখা মুহূর্তটাকে। স্বল্প সময়ের পুঁজি করা স্মৃতির নিঃশ্বাসে আরও ১০ বছর নিজেদের বাঁচিয়ে রাখার প্রত্যেয়ে যাত্রা শুরু করলো মুদ্রার উল্টোপিঠে। ঘরের সন্তান আবার ঘরে ফিরতে শুরু করলো, পেছনে পড়ে থাকলো মহাকালের গর্ভে হারিয়ে যাওয়া বিষাদ।
ঢাকা বিজনেস/এম