০৩ এপ্রিল ২০২৫, বৃহস্পতিবার



সম্পদ হাজার কোটি টাকার, পাহারাদার একজন

ফেরদৌস সিদ্দিকী, রাজশাহী || ২৯ জানুয়ারী, ২০২৩, ০১:০১ পিএম
সম্পদ হাজার কোটি টাকার, পাহারাদার একজন


রাজশাহী দুগ্ধ ও গবাদি উন্নয়ন খামারের প্রায় হাজার কোটি টাকার সম্পদ। কিন্তু এই বিশাল সম্পদের পাহারাদার মাত্র একজন। তার সঙ্গে দৈনিক মজুরিভিত্তিক ৩ জন শ্রমিক দিয়ে খামারের একটি অংশ পাহারা দেওয়া গেলেও বিশাল চারণভূমি রয়ে গেছে অরক্ষিত। ফলে প্রায়ই ঘটছে ছোটখাটো চুরির ঘটনা। 

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, বিশাল খামার এলাকার দক্ষিণে পদ্মা। পদ্মার ওপারে ভারতীয় সীমান্ত। খামার থেকে গোদাগাড়ী মডেল থানা ২০ কিলোমিটার দূরে। পাশের প্রেমতলী পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের দূরত্ব ১২ কিলোমিটার। রাতের বেলা খামারে সেভাবে পাহারা বসানো যাচ্ছে না। আর এরই সুযোগ নিচ্ছে মাদককারবারিসহ সব ধরনের অপরাধীরা।

খামার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উপজেলার রাজাবাড়িতে রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জ মহাসড়কের দক্ষিণ পাশে রয়েছে মূল খামার। মহাসড়কের উল্টো দিকে চারণভূমি। সবমিলিয়ে প্রায় ১৩২ একরের বিশাল এলাকাজুড়ে গড়ে উঠেছে খামারটি।  

চার জন মিলে কেবল গরুর খামার এবং ঘাসের ক্ষেত পাহারা দেন পালা করে। দিনের আলোয় কোনোরকমে সামালে দিলেও রাতে পুরোটাই হয়ে পড়ে অরক্ষিত। চারণভূমি পাহারার মতো লোকবল নেই। ফলে সেটি একেবারেই অরক্ষিত।



‘রাজশাহী দুগ্ধ ও গবাদি উন্নয়ন খামার’ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৬৮ সালে। তখন প্রতিষ্ঠানটির নাম ছিল এস্টাবলিস্টমেন্ট অব ডেউরি অ্যান্ড ক্যাটল ব্রিডিং ফার্ম। ১৯৮৪ সালে খামারের বর্তমান নাম গ্রহণ করা হয়। ওই সময় খামারে তিন জন পাহারাদার ছিলেন। ১৯৯২ সালে পাহারাদার ইসাহাক আলী খান মারা গেলে দুজন পাহারাদার থাকেন। এরপর ২০১৪ সালে অবসরে যান আরেক পাহারাদার লুৎফর রহমান। এরপর থেকে মাত্র একজন পাহারাদার রয়েছেন। বাকি দুই শূন্যপদে কোনো পাহারাদার নিয়োগ দেওয়া হয়নি। 

দুটি প্রকল্প রাজস্ব খাতে গেলেও পাহারাদার পদে জনবল পায়নি রাজশাহীর গো-খামার। ফলে দৈনিক মজুরিভিত্তিতে ৩ জন শ্রমিককে পাহারায় রাখা হয়েছে। অথচ পালাক্রমে খামার পাহারার জন্য অন্তত ৯ জন লোক দরকার বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

খামারের তথ্য বিশ্লেষণে জানা গেছে, ৩ জন কর্মকর্তা, ২৫ জন কর্মচারী এবং ২৫ জন দৈনিক হাজিরাভিত্তিক শ্রমিক মিলিয়ে খামারে এখন কর্মরত ৫৩ জন। এর মধ্যে স্থায়ী রাজস্ব খাতে ৪৯ পদের বিপরীতে কর্মরত ২৫ জন। এই খাতের বিভিন্ন ক্যাটাগরির ২৪টি পদ শূন্য।  

অন্যদিকে, দৈনিক হাজিরা ভিত্তিক ২৯ পদের বিপরীতে কর্মরত ২৫। এই খাতের পদ খালি ৩টি। ১৯৯৬ সালের পর থেকে দৈনিক হাজিরাভিত্তিক শ্রমিক নিয়োগও বন্ধ। মাঝে আধুনিকীকরণ প্রকল্প থেকে ৬ জন এবং দ্বিতীয় প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন প্রকল্প থেকে ৩৩ জন জনবল এসেছে খামারে। যদিও অস্থায়ী এই রাজস্ব খাতের পদ খালি ৪৮টি।

খামারের দৈনিক মজুরিভিত্তিক পাহারাদার হিসেবে ১৯৮৪ সালে যোগ দেন ৫৭ বছর বয়সী আসলাম উদ্দিন।  তিনি বলেন, ‘প্রায় ১৬ বছর ধরে  খামারের পাহারায় আছি। ভোর ৬টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত একজন পাহারা দেই। আরেকজন পাহারা দেন দুপুর ২টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত। বাকি দুজন রাত ১০টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত পাহারায় থাকেন। দিনের বেলা বাইসাইকেলে পুরো এলাকায় নজরদারি করা যায়। কিন্তু রাতে পায়ে হেঁটেই পাহারা দিতে হয়। এটি খুবই কষ্টসাধ্য।’



মাঝেমধ্যে পাহাদারের দায়িত্বপালন করেন আরেক দৈনিক মজুরিভিত্তিক শ্রমিক রবীন্দ্রনাথ সরকার।  তিনি বলেন, ‘খামারে স্থায়ী পাহারাদারের পদ মাত্র দুটি। একজন অবসরে গেছেন। রয়েছেন আরেকজন। তার সঙ্গে তিন জন দৈনিক মজুরিভিত্তিক শ্রমিক পাহারাদারের কাজ করি। আমরা কেবল খামার চত্বরই পাহারা দেই। আগে চারণভূমিতেও ২ জন পাহারাদার ছিলেন। লোকবল সংকট থাকায় এখন নেই।’

রবীন্দ্রনাথ সরকার আরও বলেন, ‘দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম গবাদি খামার এটি। এখানে হাজার কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে। এখানকার লোকজন অবসরে যাওয়ার পর নতুন করে জনবল নিয়োগ হয় না বললেই চলে।’

এ বিষয়ে রাজশাহী দুগ্ধ ও গবাদি উন্নয়ন খামারের উপ-পরিচালক ডা. আতিকুর রহমান বলেন, ‘খামার এবং গো-চারণভূমি দুটি এলাকায়। সীমিত জনবল দিয়ে খামার ও ঘাসের ক্ষেত পাহারা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু লোকবল সংকটে গো-চারণভূমি পাহারা দেওয়া যাচ্ছে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘সীমানা প্রচারীরের ১৮ স্থানের ইট খুলে নিয়ে গেছে দুর্বৃত্তরা।  বেড়া দিয়ে কোনো রকমে ফাঁকগুলো আটকে রাখা হয়েছে।  এরপরও বহিরাগতরা খামারে ঢুকে ঘাস কেটে নিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন মালামালও চুরি হচ্ছে।’ 

ঢাকা বিজনেস/এনই/



আরো পড়ুন