০৫ এপ্রিল ২০২৫, শনিবার



বিশ্বের শীর্ষ স্মার্টফোন ব্র্যান্ড ‘হুয়াওয়ে’র পতন যেভাবে

মোস্তাফিজুর রহমান || ০১ জানুয়ারী, ২০২৩, ০৬:০২ পিএম
বিশ্বের শীর্ষ স্মার্টফোন ব্র্যান্ড ‘হুয়াওয়ে’র পতন যেভাবে


বৈশ্বিক স্মার্টফোনের বাজারে হুওয়াওয়ের উত্থান ছিল অনেকটা রূপকথার গল্পের মতো। খুব দ্রুত সময়ে স্যামসাং-অ্যাপলের মতো দৃঢ় প্রতিদ্বন্দ্বীদের পেছনে ফেলে স্মার্টফোনের বাজারের শীর্ষ স্থান দখলে নিতে সক্ষম হয়েছিল চীনভিত্তিক এই স্মার্টফোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান।

তবে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের বাণিজ্যযুদ্ধের কারণে বড় ধরনের ধাক্কা খায় অ্যাপল আর স্যামসাংয়ের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠা হুয়াওয়ে। ২০১৯ সালের শুরুর দিকে  হুয়াওয়েসহ চীনা বেশ কয়েকটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে ওয়াশিংটন। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়ে গুগলসহ মার্কিন কয়েকটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সেবা ও সুবিধা হারাতে হয় হুয়াওয়েকে। এর ফলে পশ্চিমা দেশগুলোয় হুয়াওয়ের ব্যবসা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধস নামে হুহাওয়ের স্মার্টফোন ব্যবসায়।

তবে হুয়াওয়ের বিরুদ্ধে হুট করে এমন পদক্ষেপ নেয়নি যুক্তরাষ্ট্র। বেশ কিছুদিন ধরেই এমন পদক্ষেপ আসার ইঙ্গিত মিলছিল। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে হুয়াওয়ের প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা (সিএফও) মেং ওয়ানঝুকে যুক্তরাষ্ট্রের অনুরোধে গ্রেফতার করে কানাডা। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, হুয়াওয়ের মাধ্যমে চীন প্রযুক্তি চুরি ও গুপ্তচরবৃত্তি করছে। কিন্তু চীন এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে। চীন তখন জানায়, হুওয়াওয়ের প্রধান অর্থ কর্মকর্তাকে কানাডায় গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে ওই কোম্পানির ওপর চাপ প্রয়োগের চেষ্টা চলছে।

২০১৯ সালের মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘বিদেশি শত্রুদের’ কাছ থেকে তার দেশের কম্পিউটার নেটওয়ার্ক রক্ষায় জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছিলেন। বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই পদক্ষেপের আসল টার্গেট ছিল আসলে চীনা কোম্পানি হুয়াওয়ে।


হুয়াওয়ের প্রতিষ্ঠাতা রেন ঝেংফেই

হোয়াইট হাউজের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘সেনাবাহিনীর সঙ্গে সুসম্পর্ক রয়েছে এমন এক ডজনেরও বেশি চীনা প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিকল্পনামাফিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে, যেন নিষেধাজ্ঞার অধীনে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর সর্বোচ্চ প্রভাব পড়ে এবং বিশ্ব বাজার সর্বনিম্ন ক্ষতিগ্রস্ত হয়।’

হুয়াওয়ে সবচেয়ে বেশি পরিচিত তার স্মার্টফোনের কারণে। সম্প্রতি এই প্রযুক্তি কোম্পানি জানিয়েছে, ২০১৯ সালে প্রতিষ্ঠানটির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নিষেধাজ্ঞার কারণে প্রতিষ্ঠানটির মোবাইল ফোন ব্যবসা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। স্থবির হয়ে পড়ে কোম্পানির প্রবৃদ্ধি।

শুধু আমেরিকা নয় জাতীয় নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে সেসময় নিউজিল্যান্ড হুয়াওয়ে থেকে সরঞ্জাম কেনার প্রস্তাব নাকচ করে দেয়। এর আগে অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ কয়েকটি দেশের আপত্তির মুখে পড়ে কোম্পানিটি।

এসব দেশ চীনের এই টেলিকম কোম্পানি নিয়ে উদ্বিগ্ন, কারণ তারা মনে করে, বেইজিং হুয়াওয়ের মতো কোম্পানিকে শিল্পখাতের বা অন্যান্য ক্ষেত্রের গোপনীয় তথ্য সংগ্রহে বাধ্য করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চীনের গুপ্তচরবৃত্তির ব্যাপারে ক্রমেই উদ্বিগ্ন হয়ে উঠছে বিদেশি সরকারগুলো।

মোবাইল টেলিফোনের ক্ষেত্রে পরবর্তী বিপ্লব হিসেবে ধরা হয় ফাইভ-জি নেটওয়ার্ককে। হুয়াওয়ে এই ফাইভ-জি নেটওয়ার্ক বসানোর জন্য অনেক দেশের সঙ্গেই আলোচনা চালাচ্ছে। এই নতুন নেটওয়ার্ক এত দ্রুতগতির হবে যে এটি ব্যবহার করা হবে বহু নতুন কাজে। যেমন চালকবিহীন গাড়ি চালানোর কাজে।

এখন হুয়াওয়ে যদি কোন দেশের ফাইভ-জি নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করে, চীন ওই  দেশের ওপর গুপ্তচরবৃত্তি চালাতে পারবে বলে অভিযোগ তুলেছে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলো। তারা চাইলে এই ফাইভ-জি নেটওয়ার্কে আদান-প্রদান করা বার্তা পড়তে পারবে, চাইলে নেটওয়ার্ক বন্ধ করে দিতে পারবে বা সেখানে ব্যাপক প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারবে।

হুয়াওয়ে অবশ্য বারবার জোর দিয়ে বলেছে, তারা কখনোই চীন সরকারের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তি করবে না। কিন্তু সমালোচকরা একটি চীনা আইনের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন, যে কারণে কোনো কোম্পানির পক্ষে গোয়েন্দা তথ্য চেয়ে চীনা সরকারের অনুরোধ উপেক্ষা করা প্রায় অসম্ভব হবে।


বিশ্বে টেলিযোগাযোগ সরঞ্জাম নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় হুয়াওয়ে

ব্রিটিশ সাময়িকী ইকোনমিস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, মূলত মাইক্রোচিপের বাজার দখল নিয়েই এ লড়াই। কম্পিউটার চিপ এখন ডিজিটাল অর্থনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তার মূল ভিত্তি। বৈশ্বিকভাবে ইলেকট্রনিকস ডিভাইসের ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে সংশ্লিষ্ট ডিভাইসগুলোয় চিপের চাহিদাও। এতে প্রসারিত হচ্ছে সেমিকন্ডাক্টর ব্যবসা বা চিপ নির্মাণ খাত। এখনকার সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের দখল মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও এর মিত্রদেশগুলোর হাতে। কিন্তু এখন চিপের রাজ্যে হানা দিচ্ছে চীনা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো। সেমি কন্ডাক্টর খাতে স্বনির্ভর হতে চীন সরকারের প্রণোদনা বেড়ে গেছে। চীন সরকারের নির্দেশে চিপ তৈরিতে ঝাঁপিয়ে পড়েছে, আলিবাবা, বাইদু ও হুয়াওয়ের মতো বড় বড় টেক জায়ান্টরা।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র মাইক্রোচিপের বাজাররে কোনোভাবেই চীনা আধিপত্য মেনে নিতে চাইছে না।  সেজন্য হুয়াওয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে দেশটি। এছাড়া, প্রযুক্তি পণ্যে চীনের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনতে, দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি ব্যবসায়ীরা সরকারকে চাপ দিয়ে আসছিলেন।

হুয়াওয়ে হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় টেলিকম কোম্পানিগুলোর একটি। এই কোম্পানির প্রতিষ্ঠা হচ্ছেন রেন ঝেংফেই। তিনি চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির একজন সাবেক অফিসার। যুক্তরাষ্ট্র মনে করে, কোম্পানি প্রতিষ্ঠাতা যেহেতু চীনের সামরিক বাহিনীর লোক ছিল, তাই জাতীয় নিরাপত্তার জন্য একটি হুমকি হতে পারে। বিশেষ করে যেভাবে এটি বিশ্ব পরিসরে একটি বিশাল কোম্পানি হিসেবে দাঁড়াচ্ছে।

অনেকে মনে করেন, হুয়াওয়ে যেহেতু গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ নেটওয়ার্কের সব প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণে, তাই এটিকে তারা ইচ্ছে করলে গুপ্তচরবৃত্তির কাজে বা যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে দেওয়ার কাজে ব্যবহার করতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্র এক্ষেত্রে বিশেষ করে উল্লেখ করছে, চীনে পাস হওয়া একটি আইনের কথা। এই আইনে চীনের সব কোম্পানিকে দেশটির জাতীয় ইন্টেলিজেন্স নেটওয়ার্কের সঙ্গে সহযোগিতার কথা বলা হয়েছে। সূত্র: বিবিসি, ইকোনমিস্ট, নিউইয়র্ক টাইমস

ঢাকা বিজনেস/এনই/



আরো পড়ুন